প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন চীন সফর দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের মতে, ২১-২২ জুন মালয়েশিয়া সফর শেষে ২৩ জুন তিন দিনের সরকারি সফরে তিনি চীন যাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এটিই তার প্রথম বিদেশ সফর। ফলে এ সফরের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত তাৎপর্য স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই বাস্তবতায় চীন সফর শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক সফর নয়; বরং এটি বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কৌশলগত স্বার্থকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি সুযোগ।
চীন আজ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার। দেড় দশক ধরে দেশটি বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার হিসাবে অবস্থান করছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চীন থেকে ২২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি পণ্য আমদানি করেছে, যেখানে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৮৫০ মিলিয়ন ডলার। পরিসংখ্যানটি একটি বড় বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র তুলে ধরলেও এর অন্তর্নিহিত বাস্তবতা ভিন্ন। কারণ চীন থেকে আমদানি করা বেশির ভাগ পণ্যই বাংলাদেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও মধ্যবর্তী পণ্য। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ইলেকট্রনিক্স এবং অন্যান্য উৎপাদনশীল খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে চীনা উপকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে চীন শুধু একটি আমদানি উৎস নয়; বরং বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম সহায়ক শক্তি।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও গত এক দশকে চীনের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশে চীনের প্রতিশ্রুত বিনিয়োগের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। অবকাঠামো উন্নয়ন এ বিনিয়োগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় বাস্তবায়িত মহাসড়ক, রেলপথ, বন্দর, টানেল ও বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং কর্ণফুলী টানেলের মতো প্রকল্পগুলো এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
শুধু অবকাঠামো নয়, বাংলাদেশে প্রায় এক হাজার চীনা প্রতিষ্ঠান বর্তমানে বিভিন্ন খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে। তৈরি পোশাক, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নির্মাণ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তাদের বিনিয়োগ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নকে ত্বরান্বিত করছে। তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়, বৃহৎ শ্রমশক্তি এবং দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত অবস্থান বাংলাদেশের প্রতি চীনা উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরেও চীনের অবদান দৃশ্যমান। টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক, ফাইবার-অপটিক অবকাঠামো, ডেটা সেন্টার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রকল্পে চীনা প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। হুয়াওয়ে ও জেডটিইর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশে দীর্ঘদিন অংশীদার হিসাবে কাজ করছে।
এই বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কী অর্জন করতে পারে? প্রথমত, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং চলমান বা স্থগিত উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিত করা সফরের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অবকাঠামো ও শিল্প প্রকল্প অর্থায়ন সংকট, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা নীতিগত পরিবর্তনের কারণে ধীরগতির হয়েছে। এসব প্রকল্প পুনরুজ্জীবিত করতে চীনের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ আরও অনুকূল অর্থায়ন সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে। স্বল্পসুদে ঋণ, দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ ব্যবস্থা এবং অধিক নমনীয় আর্থিক শর্ত বাংলাদেশের উন্নয়ন ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তৃতীয়ত, বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা কমানোর বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। চীনা বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, সামুদ্রিক খাদ্য এবং কৃষিপণ্যের প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি দেশের রপ্তানি সম্প্রসারণে সহায়ক হবে। চতুর্থত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডিজিটাল অবকাঠামো, স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরসহ উদীয়মান খাতে সহযোগিতা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক রূপান্তরের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। চীন বর্তমানে এসব ক্ষেত্রে বৈশ্বিক নেতৃত্বের অন্যতম দাবিদার, যা বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় চীনের আরও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা, বন্দর উন্নয়ন, নীল অর্থনীতি এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসাবে বিবেচিত হবে।
সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম চীন সফরকে শুধু একটি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় সফর হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বাংলাদেশ উন্নয়ন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। যদি সফরটি বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক ফলাফল, নতুন বিনিয়োগ, বর্ধিত বাজার প্রবেশাধিকার এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে, তবে এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
দুদেশের বিদ্যমান ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্ব’কে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার মাধ্যমে এ সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা, আঞ্চলিক সংযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন লক্ষ্যের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।
মোহাম্মদ শাকিল ভূইয়া : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষক এবং চীনের শানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক
ড. মোহাম্মদ ছাইয়েদুল ইসলাম : চীনের ফুচিয়ান প্রদেশের সানমিং বিশ্ববিদ্যালয়ের ওভারসিজ এডুকেশন স্কুলের (বিদেশি ভাষা স্কুল) সিনিয়র প্রভাষক ও গবেষক
إرسال تعليق