মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক তাদের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে নতুন কাঠামোয় নিয়ে এসেছে। শুক্রবার মক্কায় তিন দেশের নেতারা ‘মক্কা জয়েন্ট ডিটারেন্স এগ্রিমেন্ট’ নামে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির মূল শর্ত হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, ঐতিহাসিক সম্পর্ক, ভ্রাতৃত্ব, ইসলামী সংহতি, অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভিত্তিতে এই সমঝোতা হয়েছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা জোরদার করাও চুক্তির লক্ষ্য।
চুক্তির আগে শেহবাজ শরিফ সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি আরবে গিয়ে ওমরাহ পালন করেন। পরে এরদোয়ান সৌদি আরবে পৌঁছে মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।
রিয়াদ ও ইসলামাবাদের মধ্যে যৌথ নিরাপত্তা সহযোগিতার আলোচনা আগে থেকেই চলছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েল হামলা এবং গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হলেও ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তা আরও তীব্র হয়। একই সঙ্গে ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রভাব ও সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়েও তিন দেশের উদ্বেগ রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন চুক্তির মাধ্যমে তিন দেশের সামরিক, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা-শিল্প সক্ষমতাকে সমন্বিতভাবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। তুরস্কের প্রতিরক্ষা শিল্প, সৌদি আরবের বিপুল আর্থিক সক্ষমতা এবং পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা ও পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতা এই সহযোগিতাকে শক্তিশালী করতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি ন্যাটোর আদলে পূর্ণাঙ্গ পারস্পরিক প্রতিরক্ষা জোট নয়। বরং তিন দেশের মধ্যে সামরিক সমন্বয়, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রতিরক্ষা ব্যয় ও উৎপাদন এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর একটি কাঠামো।
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা চলতি বছরের ১৯ মার্চ রিয়াদে সম্ভাব্য যৌথ নিরাপত্তা চুক্তির কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব পৃথক একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিও করেছিল।
ইরানের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে সংসদ সদস্য ইব্রাহিম রেজাই চুক্তির সমালোচনা করে সৌদি আরবকে নিজেদের নীতি সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরায়েলও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি। তবে তুরস্কের এক কর্মকর্তা বলেছেন, চুক্তিটি প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। অন্যদিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান দীর্ঘদিন ধরে গাজা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে আসছেন। পাকিস্তানও গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের নিন্দা জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে একদিকে এবং ইরানকে অন্যদিকে রেখে গড়ে ওঠা পুরোনো নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে চাইছে। মক্কার নতুন চুক্তি সেই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।
Post a Comment