বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটি উল্লেখযোগ্য ও স্পর্শকাতর বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে পানি ভাগাভাগি ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত বেশ কিছু আন্তঃসীমান্ত নদী এবং জলসম্পদ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে অনেক বছর ধরে নানা আলোচনার সূত্রপাত হয়েছে। বাংলাদেশের কিছু মহলে ভারতের পানি ব্যবস্থাপনার কারণে উদ্ভূত সংকটকে "পানিদস্যুতা" বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ-ভারত জলবণ্টন সংকট, এর ইতিহাস, বর্তমান পরিস্থিতি এবং এই সংকটের সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আলোচনা করা হবে।
আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পটভূমি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি আন্তঃসীমান্ত নদী রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো গঙ্গা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, এবং মেঘনা। এই নদীগুলোর পানির স্রোত এবং প্রবাহ দুই দেশের জীববৈচিত্র্য, কৃষি, শিল্প, এবং জীবনযাত্রার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। দুই দেশের মধ্যে প্রধানত গঙ্গা ও তিস্তা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক রয়েছে।
গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি
গঙ্গা নদী, যা বাংলাদেশে প্রবেশের আগে ভারত দিয়ে প্রবাহিত হয়, এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলস্রোত। ১৯৯৬ সালে, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন নিয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির অধীনে, গঙ্গার পানি দুই দেশের মধ্যে নির্দিষ্ট মাপ অনুযায়ী ভাগ করা হয়, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে। তবে, চুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে বাংলাদেশের মধ্যে একাধিক উদ্বেগ ও সমালোচনা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পায় না, যা দেশের কৃষি ও পানির নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
তিস্তা নদীর বিতর্ক
তিস্তা নদী নিয়ে জলবণ্টনের বিষয়টি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত সমস্যা। ভারত তিস্তা নদীর ওপর বেশ কিছু বাঁধ ও সেচ প্রকল্প নির্মাণ করেছে, যা বাংলাদেশের তিস্তার প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলেছে। বাংলাদেশ দাবি করে যে, তিস্তা চুক্তি না হওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর পানি প্রবাহ প্রায় শূন্যে নেমে আসে, যার ফলে কৃষি, মৎস্য, এবং পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তিস্তা চুক্তি এখনও কার্যকর করা সম্ভব হয়নি, যা দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসের সৃষ্টি করেছে।
পানিদস্যুতা: বাংলাদেশের অভিযোগ
বাংলাদেশের কিছু মহল, বিশেষ করে পরিবেশবিদ এবং পানি বিশেষজ্ঞরা, ভারতের জলবণ্টন নীতি ও ব্যবস্থাপনাকে "পানিদস্যুতা" বলে আখ্যা দিয়ে থাকেন। তাঁদের মতে, ভারত আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সরবরাহ না করে বাংলাদেশের ওপর জলসংকট সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে ভারতের পানি সরবরাহ সীমিত করার ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানি সংকট দেখা দেয়, যা পরিবেশ ও কৃষির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
জলবণ্টনের কূটনীতি ও সমঝোতা
বাংলাদেশ ও ভারত উভয়েই নিজেদের জাতীয় স্বার্থে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি ভাগাভাগি করতে চাইছে। তবে এই বিষয়ে একটি ন্যায়সঙ্গত এবং টেকসই সমাধান এখনও অর্জিত হয়নি। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক স্তরে আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আঞ্চলিক বিবেচনার কারণে প্রগতি ধীর গতিতে চলছে।
সমাধান ও সুপারিশ
১. আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিপালন: আন্তর্জাতিক জলবণ্টন আইনের আওতায় দুই দেশের মধ্যে পানির সমতা ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে পানির ব্যবস্থাপনা নিয়ে উভয় দেশ একটি ন্যায়সঙ্গত সমাধানে পৌঁছাতে পারে।
2. যৌথ নদী কমিশন শক্তিশালী করা: ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান যৌথ নদী কমিশনকে আরও কার্যকর এবং শক্তিশালী করা দরকার, যাতে নতুন চুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমে জটিলতা দূর করা সম্ভব হয়।
3. পরিবেশগত সমীক্ষা ও মূল্যায়ন: দুই দেশের উচিত পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করে সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা নীতি গ্রহণ করা, যা উভয় দেশের মানুষ এবং পরিবেশের জন্য সহায়ক হবে।
4. বিকল্প পানি উৎসের সন্ধান: বিকল্প পানি উৎসের সন্ধান করা এবং পরিবেশগতভাবে টেকসই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে পানি সংকটের সমাধান খোঁজা উচিত।
পানি সংকটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি কোনো দেশের জন্যই মঙ্গলজনক নয়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার এই জলবণ্টন সংকট সমাধানে উভয় দেশের সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ন্যায়সঙ্গত ও টেকসই একটি সমাধান না হলে, দুই দেশের জনগণের জীবনযাত্রা, কৃষি এবং পরিবেশ মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি ভাগাভাগি এবং ব্যবস্থাপনায় সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
No comments
Post a Comment